জেনটিং হাইল্যান্ড: মালোয়েশিয়ায় ভ্রমণের শেষ গন্তব্য

জেনটিং হাইল্যান্ড মালোয়েশিয়ার বিখ্যাত এক রিসোর্টের নাম। অনেক মালোয়েশিয়ানদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় এই অবকাশ যাপন কেন্দ্রটি ‘ওয়ার্ল্ড জেনটিং’ নামেও পরিচিত। এই রিসোর্টটি মালোয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর থেকে অনতিদূরে অবস্থিত।

মালোয়েশিয়ায় ঘুরতে আসা পর্যটকদের যারা তীব্র গরম ও আর্দ্র পরিবেশ থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে চান তাদের জন্য ভ্রমণের সেরা পছন্দ জেনটিং হাইল্যান্ড।

জেনটিং হাইল্যান্ডের গড় তাপমাত্রা ১৬-২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মালোয়েশিয়ানদের কাছে এই তাপমাত্রা অনেকটাই শীতলতম। এখানে থাকার খরচ খুবই কম তাই পর্যটকদের আনাগোনা বেশি থাকে সারাবছরই। বেশি বেশি বিদেশী পর্যটকদের আনাগোনা থাকায় দেশটির একমাত্র ক্যাসিনোর অবস্থানও এই এলাকায়।

জেনটিং হাইল্যান্ডে রয়েছে বিশাল আকৃতির থিম পার্ক। শিশু ও পরিবারের বিনোদনের জন্য জেনটিং হাইল্যান্ড একটি আদর্শ জায়গা। এখান থেকে পুরো কুয়ালালামপুর শহর দেখা যায় একনজরে। কারণ জেনটিং হাইল্যান্ডের অবস্থান সমুপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার ৭৬০ মিটার উপরে।

যেভাবে হলো জেনটিং হাইল্যান্ড

টান শি লিম গো টং-এর মাথায় আসে কুয়ালালামপুরের কাছে হিল রিসোর্ট নির্মাণের। ১৯৬৫ সালের ২৭ এপ্রিল তিনি জেনটিং হাইল্যান্ড বাহাদ নামে একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন।

টান শি লিম ১৯৬৫ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে ১২ একর বা চার হাজার ৯০০ হেক্টর জমি পাহাং এবং দুই হাজার ৮০০ একর বা এক হাজার ১০০ হেক্টর জমি সিলাঙ্গর রাজ্য সরকারের কাছ থেকে ব্যবহারের অনুমোদন নেন।

১৯৬৫ সালের ১৮ আগস্ট একদল দক্ষ নির্মাণ প্রকৌশলীর তত্ত্বাবধানে গঠিত নির্মাণকারী দল জেনটিং হাইল্যান্ডের সংযোগকারী রাস্তা নির্মাণের কাজ শুরু করে।

১৯৬৯ সালের ৩১ মার্চ মালয়েশিয়ার প্রথম প্রধানমন্ত্রী টিংকু আবদুর রহমান পাইওনিয়ার হোটেলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। একই সঙ্গে জেনটিং হাইল্যান্ডের জন্য নির্মিত সংযোগ সড়কের উদ্বোধন করেন।

প্রধানমন্ত্রী জেনটিং গ্রুপের একক প্রচেষ্টায় মালয়েশিয়াবাসীর জন্য পাহাড়ে রিসোর্ট নির্মাণে খুব খুশি হয়ে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

১৯৭১ সালে জেনটিং হাইল্যান্ডের প্রথম হোটেল হাইল্যান্ডের নির্মাণকাজ শেষ হয়। বর্তমানে যা থিম পার্ক হোটেল নামে পরিচিত। জেনটিং হাইল্যান্ড রিসোর্টে ১৯৭১ সালের প্রথম হোটেল নির্মাণের পর জায়গাটি ব্যাপক আকারে পর্যটকপ্রিয় হয়ে ওঠে।

জেনটিং হাইল্যান্ড

১৯৯৭ সালে জেনটিং হাইল্যান্ড রিসোর্ট, জেনটিং স্কাইওয়ে, কেব্ল কার সংযোগের মাধ্যমে তাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করে। জেনটিং স্কাইওয়ে দিয়ে কেব্ল কারের মাধ্যমে ৩.৩৮ কিলোমিটার বা ২ দশমিক ১০ মাইল পথ অতিক্রম করে খুব সহজেই পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছানো যায়।

জেনটিং স্কাইওয়ে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগতিসম্পন্ন মনোকেব্ল কার, যার গতি প্রতি ঘণ্টায় ২১ দশমিক ৬ কিলোমিটার বা ১৩ দশমিক ৪ মাইল।

আবাসস্থল

জেনটিং হাইল্যান্ডে হোটেল রয়েছে মোট ৫টি। এর মধ্যে ফাস্ট ওয়ার্ল্ড হোটেলটি আকারে সবচেয়ে বড়। ২০০৬-২০০৮ সাল পর্যন্ত এটিই ছিলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় হোটেল। এতে রয়েছে মোট ১১৮টি কক্ষ। এছাড়াও রয়েছে-

  • জেনটিং হাইল্যান্ড আগে জেনটিং গ্র্যান্ড নামে পরিচিত ছিলো।
  • এখানে রয়েছে মাক্সিম জেনটিং হোটেল যা অতীতে হাইল্যান্ড হোটেল নামে পরিচিত ছিলো।
  • রিসোর্ট হোটেল।
  • থিম পার্ক হোটেল।
  • ফাস্ট ওয়ার্ল্ড হোটেল (জেনেটিং সবচেয়ে বড় এবং বিশ্বের চতুর্থ সর্ববৃহৎ হোটেল)।

জেনটিং স্কাইওয়ে

জেনেটিং স্কাইওয়ে হলো জেনটিং হাইল্যান্ডে যাওয়ার একটি মাধ্যম। রাজধানীর কুয়ালা কুবু ভারু সিলাঙ্গরে এই স্কাইওয়ের অবস্থান। এটি একটি মনোকেব্ল কার যা ভ্রমণকারীদের জেনটিং হাইল্যান্ড রিসোর্টে পৌঁছে দেয়। নিচুতে অবস্থিত ঘটং স্টেশন থেকে এর যাত্রা শুরু হয় যা শেষ হয় জেনটিং হাইল্যান্ডে।

জেনটিং হাইল্যান্ডের বিশেষ আকর্ষণ

জেনেটিং হাইল্যান্ডের রিসোর্টে রয়েছে চারটি পারফরমেন্স ভেন্যু-

  • এরিনা অব স্টারস।
  • জেনটিং ইন্টারন্যাশনাল শোরুম।
  • জেনটিং ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টার।
  • ফাস্ট ওয়ার্ল্ড প্লাজা।

জেনটিং হাইল্যান্ড ইনডোর থিম পার্ক রাইড

বাচ্চাদের জন্য যেসব রাইডসমূহ-

  • ক্যারোসেল।
  • জুনিয়র বাম্পার কার।
  • রাইড দ্য প্যারিস।
  • বিজি বাগস।
  • সার্কাস রাইড।
  • ফানল্যান্ড।

পরিবার নিয়ে ভ্রমণ করার মতো রাইডসমূহ

  • মিনি ট্রেন।
  • রেইনডিয়ার ক্রুইজ।
  • মনোরেল।
  • ভেনিস গানডোলা।
  • রিও ফ্লয়েট।

থ্রিলিং রাইডস

  • ইউরো এক্সপ্রেস।
  • অ্যাডাল্ট বাম্পার কার।
  • ৪উ মোশন মাস্টার।

ভিডিও গেমস পার্ক

  • ফ্যান্টাসি ওয়ার্ল্ড।
  • ভিশন সিটি।

এছাড়াও রয়েছে-

  • জেনটিং স্কাই ভেনচার।
  • স্নো ওয়ার্ল্ড।
  • রেইন ফরেস্ট স্প্যাশ পুল।
  • স্নোকার সেন্টার।

জেনটিং হাইল্যান্ডের বিশেষত্ব

  • জেনটিং হাইল্যান্ডের হোটেল, পার্ক, শপিংমলের অবস্থান সুন্দরভাবে সন্নিবেশিত। জেনটিং রিসোর্ট থেকে নিম্নমুখী সিঁড়ি দিয়ে খুব সহজেই ক্যাসিনো ও থিম পার্কে যাওয়া যায়।
  • ফাস্ট ওয়ার্ল্ড প্লাজার ফুড কোর্ট ও রেস্টুরেন্টে খাবারের ভিন্নতার শেষ নেই। যে কেউ নিজের পছন্দ অনুযায়ী খাবার পছন্দ করে এখান থেকে কম খরচে খেতে পারবে।
  • প্রতিটা হোটেলের আলাদা আলাদা পার্কিংব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে প্রচুর পরিমাণে গাড়ি পার্কিংয়ের সুব্যবস্থা আছে।

ফাস্ট ওয়ার্ল্ড হোটেল

জেনটিং হাইল্যান্ডের ফাস্ট ওয়ার্ল্ড হোটেল এক সময় বিশ্বের সবচেয়ে বড় হোটেল হিসেবেই খ্যাত ছিলো যা বর্তমানে রয়েছে বড় হোটেলগুলোর মধ্যে ৪ নম্বরে। হোটেলটিতে পর্যটকদের ব্যবহারের জন্য রয়েছে মোট ১১৮টি কক্ষ। 

এতগুলো কক্ষ মোট দুটি টাওয়ারে বিভক্ত যার প্রত্যেকটিতে রয়েছে ২৩টি করে মোট ৪৬টি ফ্লোর। হোটেলটিতে ছয়টি ভিন্ন ধরনের কক্ষের ব্যবস্থা রয়েছে। যথা- স্ট্যান্ডার্ড রুম, স্ট্যান্ডার্ড ভিউ, ডিলাক্স, ডিলাক্স ভিউ, সুপার ডিলাক্স রুম ও ওয়ার্ল্ড ক্লাব।

সুপার ডিলাক্সের কক্ষগুলোতে মিনিবার, চুল শুকানো মেশিনসহ কোনো ধরনের রুম সার্ভিসের ব্যবস্থা নেই। ওয়ার্ল্ড ক্লাব মানের কক্ষগুলোতে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধার সুব্যবস্থা রয়েছে। হোটেলটির কক্ষ সংখ্যা বাড়াতে সঙ্গত কারণেই রুমের আকার-আকৃতি ছেট করতে হয়েছে প্রকৌশলীদের। এখানকার সবচেয়ে ছোট যে রুমটি রয়েছে তার সাইজ ২০৭ বর্গফুট। জেনটিং হাইল্যান্ডের রুমের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় পর্যটকদের রুম বুকিংয়ের সময়ে অনেক লম্বা লাইনে দাড়াতে হয়। বেশি রুম থাকায় রুম হারিয়ে ফেলা বা পাল্টে যাওয়া যেন এখানকার নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার।

বিনোদন পার্ক এবং অন্যান্য আকর্ষণ

শুধু পর্যটকদের জন্যই নয় বিনোদনের জন্য স্থানীয়রাও নিয়মিত বেড়াতে আসেন জেনটিং হাইল্যান্ডে। কুয়ালালামপুরের তীব্র উষ্ণতায় একটু শীতল নি:শ্বাস নিতেই স্থানীয়রা এখানে বেড়াতে আসেন। জেনটিং হাইল্যান্ডের পুরো এলাকাটিই হোটেল ও পার্কে ঠাসা। তাই ভ্রমণকারীর বিনোদন পার্কে ঘুরাঘুরি ও ক্যাসিনোতেই সীমাবদ্ধ।

হাইল্যান্ডের মূল থিম পার্ক ছাড়াও অন্যান্য বিনোদনব্যবস্থা রয়েছে; যেমন- ভিডিও গেমস, তির নিক্ষেপ, দেয়াল বেয়ে ওঠা, স্নোকার, বোলিং, স্কাই ড্রাইভিং প্রভৃতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *